পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক কাঠামোয় এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ঘোষণা করল রাজ্য সরকার। চলতি বাজেট অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত রাজ্যের প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা তুলে ধরেন। তাঁর ঘোষণায় জানানো হয়েছে, রাজ্যের প্রশাসনিক পরিষেবাকে আরও কার্যকর ও জনমুখী করে তুলতে একসঙ্গে পাঁচটি নতুন জেলা গঠনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। নতুন জেলার তালিকায় রয়েছে কলকাতা, বসিরহাট, সুন্দরবন, জঙ্গিপুর এবং আরামবাগ।
দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন অঞ্চলের বাসিন্দারা প্রশাসনিক সুবিধা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে পৃথক জেলার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, বিস্তীর্ণ ভৌগোলিক এলাকা এবং উন্নয়নমূলক প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা থেকেই এই দাবিগুলি গুরুত্ব পেতে শুরু করে। অবশেষে রাজ্য সরকারের তরফে সেই দাবির প্রতি ইতিবাচক সাড়া মিলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বাজেট ভাষণে অর্থমন্ত্রী জানান, নতুন জেলা গঠনের ফলে সাধারণ মানুষের কাছে প্রশাসনিক পরিষেবা আরও সহজলভ্য হবে। সরকারি দফতরে পৌঁছাতে কম সময় লাগবে, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধা দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছাবে এবং স্থানীয় প্রশাসনের কাজের গতি বাড়বে। বিশেষ করে দূরবর্তী ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসিন্দারা এই সিদ্ধান্তের ফলে উল্লেখযোগ্যভাবে উপকৃত হবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
শুধু নতুন জেলা গঠনই নয়, প্রশাসনিক পরিকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে একাধিক নতুন উদ্যোগের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। উপকূলবর্তী কাঁথি অঞ্চলে একটি পৃথক পুলিশ জেলা গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের মতে, উপকূলীয় এলাকার নিরাপত্তা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার ক্ষেত্রে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত কার্যকর হবে।
এছাড়াও পশ্চিমাঞ্চলের গোপীবল্লভপুরকে নতুন মহকুমা হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ঝাড়গ্রাম ও সংলগ্ন এলাকার প্রশাসনিক কাজকর্ম আরও সুসংগঠিত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রয়োজন মেটাতে আর দূরে যেতে হবে না, যা সময় ও অর্থ—উভয় ক্ষেত্রেই সাশ্রয় ঘটাবে।
রাজ্য সরকারের ঘোষণায় আরও জানানো হয়েছে যে, স্থানীয় স্বশাসন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে নয়টি নতুন পুরসভা গঠন করা হবে। শিবনিবাস, গাজোল, টাল, বেলদা, বাগনান, জয়গী, কোলাঘাট, কামারপুকুর এবং টুঙ্গিপাড়ি এই নতুন পুরসভার তালিকায় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলিতে নাগরিক পরিষেবার মানোন্নয়ন, পরিকাঠামোগত উন্নয়ন এবং স্থানীয় উন্নয়নমূলক প্রকল্পের বাস্তবায়নে এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে প্রশাসনের ধারণা।
নতুন জেলার ঘোষণা প্রকাশ্যে আসতেই বিভিন্ন এলাকায় উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আরামবাগে বহু বছর ধরে পৃথক জেলার দাবিতে আন্দোলন চলছিল। সেই দাবি পূরণ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই স্থানীয় মানুষ আনন্দে মেতে ওঠেন। বিভিন্ন জায়গায় মিষ্টি বিতরণ, শুভেচ্ছা বিনিময় এবং উদযাপনের ছবি সামনে এসেছে। বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন।
একই ধরনের উচ্ছ্বাস দেখা গিয়েছে বসিরহাট এলাকাতেও। বহু মানুষের বিশ্বাস, নতুন জেলা গঠিত হলে প্রশাসনিক কেন্দ্র মানুষের আরও কাছে চলে আসবে। ফলে জমি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা ও অন্যান্য সরকারি পরিষেবার কাজ দ্রুত সম্পন্ন হবে। স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে নতুন জেলা ও প্রশাসনিক ইউনিট গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় জমি নির্বাচন, সরকারি ভবন নির্মাণ, দফতর স্থানান্তর এবং অন্যান্য পরিকাঠামোগত প্রস্তুতির কাজ শুরু হবে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে খুব শীঘ্রই পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক মানচিত্রে এই নতুন পরিবর্তনের বাস্তব রূপ দেখা যেতে পারে।
রাজ্য সরকারের মতে, এই প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস শুধুমাত্র সীমান্ত পরিবর্তনের বিষয় নয়; বরং উন্নয়নকে তৃণমূল স্তরে পৌঁছে দেওয়া এবং প্রশাসনকে আরও জনবান্ধব করে তোলার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। ফলে আগামী দিনে নতুন জেলা ও প্রশাসনিক ইউনিটগুলির মাধ্যমে রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হবে বলেই আশাবাদী প্রশাসনিক মহল।


